ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের বজ্রপাতপ্রবণ দেশগুলোর একটি। শুধু বজ্রপাতের ঘনঘটাই নয়, এতে প্রাণহানির দিক থেকেও দেশটি রয়েছে শীর্ষ ঝুঁকিতে। বেসরকারি সংস্থা ডিজাস্টার ফোরামের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বজ্রপাতে দেশে মারা গেছেন অন্তত ৪ হাজার ১৫৮ জন, অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ২৯৭ জন। জাতিসংঘের তথ্যমতে এই সংখ্যাটি ৩০০-এর কাছাকাছি।
বৃহৎ উদ্বেগের বিষয় হলো, বজ্রপাতে প্রাণ হারানোদের প্রায় ৭০ শতাংশই কৃষক। মাঠে কাজ করার সময় হঠাৎ বজ্রাঘাতে তাদের মৃত্যু হচ্ছে। যেমন সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে কাঁকরোল ক্ষেতে কাজ করার সময় মারা যান এক কৃষক। এর আগের দিন কিশোরগঞ্জের তিনটি উপজেলায় বজ্রপাতে মারা গেছেন আরও তিন কৃষক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়কাল বজ্রপাতের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময়ই দেশে বোরো ধান কাটার ও আমন রোপণের ভরা মৌসুম। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা মতে, এই সময়ে বজ্রপাতের প্রকোপ যেমন বেশি, তেমনি মাঠে কৃষকের উপস্থিতিও সর্বাধিক। ফলে প্রাণহানির আশঙ্কাও বেড়ে যায়।
উল্লেখযোগ্য যে, দেশের যেসব জেলা কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোকেই এখন বজ্রপাতের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, সিলেট, ও ময়মনসিংহ এই তালিকায় রয়েছে। এসব এলাকায় হাওর বা সমতল জমিতে সাধারণত বড় গাছ বা উঁচু কাঠামো না থাকায় মাঠে কর্মরত কৃষকই বজ্রপাতের প্রথম লক্ষ্যবস্তু হন।
২০১৬ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা হলেও এই খাতে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। বরং প্রতিবছরই মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। উন্নত দেশগুলো যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি, পূর্বাভাস, ও লাইটনিং অ্যারেস্টারের মাধ্যমে প্রাণহানি কমিয়ে এনেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনো সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বজ্রপাত বেশি হয় ভোরবেলা, দুপুর ১১টা থেকে ১টা, এবং বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে। এই সময় কৃষকদের মাঠে কাজ না করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বজ্রপাতের পূর্বাভাস পৌঁছে দিতে হবে সরাসরি কৃষকদের হাতে। এ কাজে রেডিও, মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে।
তবে শুধু পূর্বাভাস নয়, হটস্পট এলাকাগুলোতে বজ্রনিরোধক আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলাও জরুরি, যেখানে কৃষকরা ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারবেন। পাশাপাশি ভবন ও বৈদ্যুতিক টাওয়ারে লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন এবং সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়মিত তদারকি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের কৃষি ইতোমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তন, জমির সংকট, ও কৃষি উপকরণের দামের ঊর্ধ্বগতির মতো নানা চাপে আছে। তার ওপর বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি কৃষিকে আরও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এতে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে।
এই বাস্তবতায় এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, যাতে বজ্রপাত থেকে কৃষক ও কৃষি—দুইয়েরই সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।