নিজস্ব প্রতিবেদক :
লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জের চরমনসা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ভবানীগঞ্জ কারামতিয়া ফাজিল মাদ্রাসা। ১৭৪ বছরের পুরনো ধর্মীয় এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আজও স্ব-গৌরবে শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে যাচ্ছে।
ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় অধীভুক্ত প্রতিষ্ঠানটির কমিটির আন্তরিকতা এবং শিক্ষকদের নিরলস প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলো ছড়িয়ে চলেছে।
জানা গেছে, ১৮৫২ সালে মহান আধ্যাত্মিক সাধক হযরত মাওলানা কারামত আলী সিদ্দিকী জৈনপুরী (র.) দ্বীনি শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে ২ একর ১০ শতাংশ জমির উপর মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু থেকে এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে মাদ্রাসাটি ব্যাপক অবদান রেখে আসছে, যা আজও অব্যাহত আছে। ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক ও বিজ্ঞান ভিত্তিক জ্ঞান বিতরণে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।
উপমহাদেশের প্রাচীনতম এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে এক মলাটে আবদ্ধ করতে ২০২৫ সাল আল কারামাহ নামে একটি স্মরনিকা প্রকাশ করেছে, যা জেলাতে প্রথম স্থান অর্জন করেছে এবং জেলা প্রশাসক কর্তৃক পুরষ্কৃত হয়েছে।
ভবানীগঞ্জ কারামতিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অর্জনের ঝুলিতেও রয়েছে একের পর এক সাফল্য। শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও ক্রীড়ায় প্রতিষ্ঠানটির অর্জন চোখে পড়ার মতো।
২০২৫ সালে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে উপজেলার ১৩ টি ইভেন্টে প্রথম স্থান এবং জেলা পর্যায়ে ৭ টি ইভেন্ট প্রথম হয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করে। একই বছরে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৪৬ তম বিজ্ঞান মেলায় জাতীয় পর্যায়ে অংশ গ্রহণের সুযোগ পায়। মাধ্যমিক পর্যায়ে জেলাতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। চলতি বছরে ক্রীড়া ইভেন্টে জেলা পর্যায়ে ৯ টি পুরষ্কার অর্জন করতে সক্ষম হয়।
এছাড়া ২০২৬ সালে ৫৪তম শীতকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১ম স্থান ৩ জন, ২য় স্থান ৩ জন, ৩য় স্থান ৩ জনসহ মোট ৯ জন শিক্ষার্থী পুরস্কার লাভ করেন।
সহশিক্ষা কার্যক্রমেও এগিয়ে আছে ভবানীগঞ্জ কারামতিয়া ফাজিল মাদ্রাসা। মাদ্রাসাটিতে রয়েছে স্কাউট, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড ও রেঞ্জার্স গ্রুপ। এসব কার্যক্রমে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ১ম স্থান অর্জন করে বিভাগীয় পর্যায়ে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ মূল্যায়নে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান মাওলানা মোহাম্মদ ইব্রাহীম শামিম জানান, ১৮৫২ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে মাদ্রাসাটি সময়ের সাথে সাথে ধাপে ধাপে একাডেমিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা পেয়েছে। শুরুতে কলকাতা থেকে স্বকৃীতিপত্র পেয়ে ১৯০৪ সাল থেকে দাখিল, ১৯২৭ সালে আলিম এবং ১৯২৯ সালে ফাজিল স্তরের স্বীকৃতি লাভ করে প্রতিষ্ঠানটি।
মাদরাসাটিতে ১ম জামায়াত থেকে ফাজিল পর্যন্ত পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। দাখিল ও আলিম পর্যায়ে মানবিক বিভাগের পাশাপাশি বিজ্ঞান বিভাগ চালু রয়েছে। ফাজিল স্তরে রয়েছে বি.এ, বি.এস.এস ও বি.এস.সি গ্রুপ যা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করছে।
মাদ্রাসাটিতে রয়েছে একটি আধুনিক বিজ্ঞান ল্যাব ও একটি আইসিটি ল্যাব। এখানে শিক্ষার্থীদের ইসলামী ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে যুগোপযোগী পাঠদান করা হয়।
স্বাধীনতার পর থেকে এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন জেলা প্রশাসক। বর্তমানে এর প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন মাওলানা মোহাম্মদ ইব্রাহীম শামিম। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে ৪৬ জন শিক্ষক ও প্রায় ২৬০০ শিক্ষার্থী রয়েছে।
দীর্ঘ ইতিহাস, শৃঙ্খলাবদ্ধ শিক্ষা পরিবেশ ও আধুনিক সুযোগ–সুবিধার সমন্বয়ে ভবানীগঞ্জ কারামতিয়া ফাজিল মাদ্রাসা আজ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এলাকার গর্ব, ঐতিহ্য ও আলোকবর্তিকা।