স্টাফ রিপোর্টার :
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলায় ওয়ে হাউজিং প্রাইভেট লিমিটেডের বিরুদ্ধে শত কোটি টাকার প্রতারণা করে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। কোম্পানিটির ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন রামগঞ্জ উপজেলার মধ্যবিত্ত ও নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের শত শত প্রবাসী, প্রবাসীদের স্ত্রী, স্কুল শিক্ষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ। মুনাফার লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন মেয়াদে সঞ্চয় প্রকল্প ও কোম্পানির শেয়ারের প্রলোভন দিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করা হয়। গ্রাহকদের সঞ্চিত অর্থ হাতিয়ে নিয়ে নামে- বেনামে ঢাকার সাইনবোর্ড এলাকায় স্টাফ কোয়ার্টার রোডে হাদিদ টাওয়ার, রামগঞ্জ সিটি প্লাজা, সিটি প্লাজা সংলগ্ন- পপুলার সিটি প্লাজা, কুমিল্লার গাংচর রোডের মোগলটুলি এলাকা ওয়ে হাজি রফিকুল ইসলাম প্যালেস, পৌর ৩নং ওয়ার্ড রতনপুরে ৭তলা ভবন, পৌর টামটা পানির টাংকি সংলগ্ন এলাকায় বিপুল সংখ্যক ফসলি জমি ক্রয়, লক্ষ্মীপুর ও চাটখিলে জমি ক্রয়সহ সিরাজগঞ্জ জেলায় তাদের বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ চলমান।
অপরদিকে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ মেয়াদ শেষে টাকা তুলতে গেলে কোম্পানির লোকজন নানা অজুহাত দেখায়। বছরের পর বছর কোম্পানীর কর্তাদের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষুকের মতো ঘুরছেন নিজের পরিশ্রমের সঞ্চয়ের টাকা ফেরত পেতে।
ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ পৌর এলাকার দক্ষিণ বাজার সংলগ্ন সিটি প্লাজা মার্কেটের একটি ফ্লাটে তাদের অফিস কক্ষে গত ২ বছর থেকে তালা দেয়া। মাঝে মাঝে আমরা গিয়ে দুই একজন কর্মকর্তাকে পেলেও তারা আমাদের এ বিষয়ে কোন সমাধান করতে পারবেনা বলে সাফ জানিয়ে দেন।
স্কুল শিক্ষক মৃত শাহ আলমের স্ত্রী বেলায়েতের নেছা জানান, আমার স্বামী দাশপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের অবসরকালীন ভাতার ১২লাখ টাকা ২০২৩ সনে ওয়ে হাউজিংয়ে ৫বছরের জন্য এককালীন জমা রাখি। মাসে মাসে ১৪ পার্সেন্ট মুনাফা দেয়ার কথা থাকলেও অধ্যাবদি এক টাকাও দেয়নি তারা। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমার ফোন রিসিভ না করায় চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছি।
ভুক্তভোগিরা জানান, “জীবনের সমস্ত সঞ্চয় তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম, কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার পর টাকা আর পাইনি। বহুবার গিয়েছি, শুধু ঘুরিয়েছে” বলে জানান ফল বিক্রেতা মো. শরিফুল ইসলাম। তিনি আরও জানান, ২০২৩ সালে ওয়ে হাউজিংয়ের কর্মকর্তা জোটন মজুমদারের মাধ্যমে ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা জমা করেছিলেন। প্রথমে সামান্য কিছু টাকা ফেরত পেলেও পরবর্তীতে আর কোনো টাকা পাননি। বহু বৈঠকেও কোনো সমাধান হয়নি। দিনের পর পর দিন তাদের কাছে গিয়েছি। বাধ্য হয়ে থানায় অভিযোগ করেছেন তিনি।
রামগঞ্জ বাজারের ডেন্টিস্ট মো. সবুজ জানান, প্রতিদিন ৫০০/১০০০ টাকা করে জমিয়ে দুই লাখ টাকা সঞ্চয় করেছিলাম। মেয়াদ শেষে টাকা তুলতে গেলে অফিস থেকে দুই বছর পর আসতে বলা হয়। সেই সময়ও পার হয়ে গেছে। আপনাদের (সাংবাদিক) তথ্য দেয়ার অপরাধে তারা আমাকে হুমকি দেয় যে আপনাকে কোন টাকা দেয়া হবে না। এখন আর তাদের অফিসে যাই না। বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি।
জিয়া শপিং কমপ্লেক্সের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ‘সাদামন’ এর মালিক আনোয়ার হোসেন বলেন, ২০২২ সালে সঞ্চয় শুরু করেছি। এক বছর পর তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা জমা হয়। টাকা তুলতে গেলে অফিস নানা অজুহাত দিয়ে এক মাস দুই মাস করে সময় নেয়। এখনও টাকা ফেরত পাননি তিনি। আমার নিকটাত্মীয় মারাত্মক অসুস্থ্য হওয়ার পর তাদের কাছে গিয়েছি চিকিৎসার করানোর জন্য অন্তুত কিছু টাকা দেয়া হোক, কিন্তু দেয়নি। গত এক বছরে সময় নিয়েছে অর্ধশত বার। রামগঞ্জের বহু মানুষ এই প্রতারণার শিকার হয়ে এখন পথে পথে ঘুরছে।
রামগঞ্জ কাঠ বাজার এলাকার ফার্মাসিস্ট শাহাদাত হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, ২০১৭ সালে পাঁচ বছরের মেয়াদে একটি ডিপিএস করেছিলেন। মেয়াদ শেষে আড়াই বছর কেটে গেলেও টাকা পাননি। বরং অফিসে গিয়ে অপমানিত হতে হয়েছে বারবার।
নোয়াগাঁও ইউনিয়নের বাসিন্দা ওমান প্রবাসীর স্ত্রী পিংকি আখতার জানান, ২০১৮ সাল থেকে তিনি সঞ্চয় শুরু করেছিলেন। মেয়াদ শেষ হলেও টাকা ফেরত পাননি। যখন তাঁর স্বামী ওমানে আইনি জটিলতায় পড়েন, তখন তিনি অফিসে গিয়ে লভ্যাংশ বাদ দিয়ে শুধু মূল টাকা চেয়ে অনুরোধ করেন। কিন্তু অফিস থেকে বলা হয়, “আপনার স্বামী তো জেলে, টাকার দরকার কী!”
ওয়ে হাউজিংয়ের স্থানীয় পরিচালক শিহাব সুমন জানান, রামগঞ্জ- ফেনী- হাজীগঞ্জ ও দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। করোনার কারণে কিছু সমস্যা হয়েছে। আমরা নিয়মিত টাকা পরিশোধ করছি। কয়েক মাসের মধ্যেই সবাইকে মুনাফাসহ টাকা ফেরত দেয়া হবে।
উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেন, ওয়ে হাউজিংয়ের কার্যক্রম বিষয়ে আমার কিছু জানা নাই। তবে জয়েন্ট স্টক কোম্পানী আইনে তারা ঢাকা থেকে নিবন্ধন নিয়েছে যতদূর জেনেছি। ওয়ে হাউজিংয়ের বিষয়ে আমাদের কাছে কোন অভিযোগও নেই।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারাশিদ বিন এনামের কাছে মুঠোফোন বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি দৈনিক বাংলার মুকুলকে বলেন আমি রামগঞ্জে নতুন এসেছি, ওয়ে হাউজিং কর্তৃক গ্রহকদের সাথে অনিয়মের ব্যাপারে গত দশ বছরে রামগঞ্জ উপজেলার বিগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গনের কাছে অনেক ভুক্তভুগী ইতিমধ্যে অভিযোগ দিয়েছেন। যেহেতু এটি অর্থ লেনদেনের বিষয়ে প্রতারণার অভিযোগ, তাই প্রত্যেক ভুক্তভোগীকে আমাদের তরফ থেকে আদালতে গিয়ে আইনি আশ্রয় নেয়ার জন্য বলা হয়েছে। আদালত থেকে আমাদেরকে যদি কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়, তখন এব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে।